আইএমএফের পূর্বাভাস

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের মন্দার আশঙ্কা

ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে পড়ছে।

এ যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হয়ে যাবে বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। সম্প্রতি তিনি জানান, আগামী সপ্তাহে আইএমএফ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য তাদের আগের পূর্বাভাস কমিয়ে দেবে। একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও অর্থনীতির ওপর যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত থেকে যাবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। খবর এপি ও দ্য গার্ডিয়ান।

আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সেই বৈঠকের আগে দেয়া এক বক্তব্যে জর্জিয়েভা বলেন, ‘এ যুদ্ধ শুরু না হলে আমরা বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আরো বাড়াতে পারতাম। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের সবচেয়ে আশাবাদী পরিকল্পনাতেও প্রবৃদ্ধির হার কমিয়ে ধরতে হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এ যুদ্ধ পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনযাত্রার মান স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আইএমএফ প্রধান জানান, যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তেল শোধনাগার, ট্যাংকার টার্মিনাল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো। এছাড়া বিশ্বজুড়ে কৃষকের প্রয়োজনীয় সারের সরবরাহও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এসব কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করছে।

গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শর্তসাপেক্ষ একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতির হুঁশিয়ারি দেয়ার পর এ সিদ্ধান্ত আসে। তবে আইএমএফ প্রধান মনে করেন, এ শান্তি চুক্তি দীর্ঘস্থায়ী হলেও অর্থনীতির ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে না। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন এবং বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত করতে কত সময় লাগবে, তা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে।

সম্প্রতি যুদ্ধবিরতি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারো বেড়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়। জর্জিয়েভা জানান, আমদানিনির্ভর দেশ এবং দরিদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলো এ জ্বালানি সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অনেক দেশের ঋণের বোঝা এরই মধ্যে অনেক বেশি হওয়ায় তারা চাইলেও কর কমিয়ে বা খরচ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সহায়তা করতে পারছে না।

এমন পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের প্রতি সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আইএমএফ প্রধান। তিনি বলেন, ‘কোনো দেশ যেন এককভাবে পণ্য রফতানি বন্ধ বা কঠোর মূল্য নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করে। তিনি একে “‍আগুনে পেট্রল ঢালার” সঙ্গে তুলনা করেন। বরং সরকারের উচিত সীমিত সম্পদ দিয়ে সবচেয়ে অসহায় পরিবারগুলোকে সহায়তা করা।’

একই সময়ে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের (বিওআই) গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি এ যুদ্ধকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি ‘বিরাট ধাক্কা’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘পরিস্থিতি এখনো খুবই অস্থির। এর আগে আইএমএফ ২০২৬ সালের জন্য ৩ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল, যা আগামী মঙ্গলবার প্রকাশিতব্য প্রতিবেদনে আরো কমিয়ে আনা হবে।’

আইএমএফ প্রধানের এ সতর্কবার্তা থেকে স্পষ্ট যে বিশ্ব শান্তি ফিরলেও যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে মানুষকে ভোগাবে। এখন সব দেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দায়িত্বশীলভাবে আর্থিক নীতি পরিচালনা করা এবং নতুন করে অর্থনৈতিক শক্তি সঞ্চয় করা।

আরও